কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি
প্রেস থেকে প্রকাশিত গবেষণাগ্রন্থগুলির মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বই “থ্রি হানড্রেড
ইয়ারস অব গ্র্যাভিটেশান” প্রকাশিত হয়েছে ১৯৮৭ সালে। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন
হকিং এবং ওয়ারনার ইসরায়েল এই বইটির সম্পাদনা করেছেন। এই বইটি বিজ্ঞানের ইতিহাসের অনন্য
এক আবিষ্কারের স্বীকৃতি – যে আবিষ্কারের নাম “মহাকর্ষ”। ১৬৮৭ সালে স্যার আইজাক নিউটনের
‘প্রিন্সিপিয়া’ প্রকাশের ঠিক তিন শ বছর পর প্রকাশিত এই ‘মহাকর্ষের তিন শ বছর’ বইটি
নিউটনের প্রিন্সিপিয়ার গুরুত্বকে বিশেষভাবে স্বীকৃতি দেয়। স্টিফেন হকিং এই বইয়ের একেবারে
শুরুতেই দ্ব্যার্থহীনভাবে বলেছেন ‘দ্য ফিলোসফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা’
(প্রিন্সিপিয়া) হলো এ যাবত প্রকাশিত ভৌতবিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একক বই [১]।
বিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রিন্সিপিয়ার প্রকাশের বছরকেই গাণিতিক মহাকর্ষের আবির্ভাবের বছর
হিসেবে ধরা হয়।
প্রিন্সিপিয়াতেই
সর্বপ্রথম পৃথিবীর বস্তুগত গতি এবং মহাকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের গতি—উভয়কে একই সার্বজনীন
নিয়মের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নিউটন এই বইতে গতির তিনটি সূত্র এবং সার্বজনীন
মহাকর্ষের সূত্র প্রণয়ন করে দেখান যে একটি আপেলের পতন আর চাঁদের কক্ষপথে ঘোরা—দুটিই
ভৌতবিজ্ঞানের একই নিয়ম মেনে চলে। এর মাধ্যমে প্রকৃতির ঘটনাকে নির্ভুল গণিতের ভাষায়
প্রকাশ করার এক নতুন যুগের সূচনা হয়, যেখানে গণিত হয়ে ওঠে পদার্থবিজ্ঞানের প্রধান ভাষা।
প্রিন্সিপিয়া শুধু সূত্রই দেয়নি, পর্যবেক্ষণ,
পরীক্ষা ও গাণিতিক যুক্তিকে একত্র করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর একটি শক্তিশালী পদ্ধতিও
প্রতিষ্ঠা করেছে। প্রিন্সিপিয়া জন্ম দিয়েছে
ভৌতবিজ্ঞানের মূল কাঠামো – নিউটনীয় বলবিদ্যার। দুই শতাব্দীর বেশি সময় ধরে নিউটনীয় বলবিদ্যা
জ্যোতির্বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রিন্সিপিয়া
কেবল কিছু মৌলিক প্রাকৃতিক সমস্যার সমাধান দেয়নি, বরং প্রকৃতিকে দেখার বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি
তৈরি করে দিয়েছে। প্রিন্সিপিয়ার সাথেই জন্ম হয়েছে ক্লাসিক্যাল মেকানিক্স বা চিরায়ত
বলবিদ্যার এবং গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানের।
বই হিসেবে প্রকাশিত
হবার প্রায় বিশ বছর আগে এর বিষয়বস্তুর গবেষণা এবং গাণিতিক হিসেবগুলি করেছিলেন আইজাক
নিউটন কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির ছাত্রাবস্থায়। ১৬৬১ সালে ১৯ বছর বয়সে কেমব্রিজের ট্রিনিটি
কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন নিউটন। ট্রিনিটি কলেজের বেতন আর হোস্টেলের ফি মেটানোর জন্য নিউটনকে
একটা অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ দেয়া হয়েছিল। তার বদলে তাকে সিনিয়র ছাত্রদের ফাইফরমাশ খাটতে
হতো। স্কলারশিপ পেলে এধরনের কোন কাজ করতে হয় না। নিউটন চেষ্টা করলেন ফার্স্ট ইয়ারের
পরীক্ষায় ভালো করে সেকেন্ড ইয়ারে একটা স্কলারশিপ জোগাড় করার। সেইসময় ইউরোপের অন্যান্য
বিশ্ববিদ্যালয়ে কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও আর কেপলারের নতুন তত্ত্বগুলি পড়ানো শুরু হয়ে
গেলেও কেমব্রিজের পড়াশোনা তখনো এরিস্টোটলের পৃথিবীকেন্দ্রিক পদার্থবিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ
রয়ে গিয়েছিল। নিউটন নিজে নিজে নতুন তত্ত্বগুলি পড়তে শুরু করেছিলেন। ফলে ফার্স্ট ইয়ারের
পরীক্ষায় জ্যামিতিতে ফেল করলেন। তখন কেমব্রিজের শিক্ষকরা ভাবতেও পারেননি যে এই জ্যামিতিতে
ফেল করা ছেলেটাই কয়েক বছরের মধ্যে মহাবিশ্বের নতুন জ্যামিতি রচনা করবেন।
১৬৬৫ সালে ইংল্যান্ডে
বুবোনিক প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। প্রায় ৭৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় প্লেগে। স্কুল-কলেজ
সব বন্ধ হয়ে যায় দুই বছরের জন্য। ১৬৬৫-৬৬ – এই দুই বছর নিউটন তার জন্মস্থান উল্সথর্পের
খামারবাড়িতে কাটান। প্রচুর আপেল-গাছ ছিল সেই ফার্মে (এখনো আছে)। এই দুই বছরের নিভৃতবাসের
সময় তিনি আবিষ্কার করেন তাঁর যুগান্তকারী সূত্রগুলি। গাছ থেকে আপেল পড়তে দেখে তিনি
আবিষ্কার করেন মহাকর্ষ সূত্র। আরো আবিষ্কার করেন – ক্যালকুলাস, আলোর প্রকৃতি। গ্যালিলিও
এবং কেপলারের প্রকাশিত গবেষণার উপর বিস্তারিত কাজ করেন তিনি। এই দুই বছরে তিনি যতকিছু
আবিষ্কার করেছেন – সেগুলিই পরবর্তী দুই শ বছর ধরে নির্ভুলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের
পাঠে এবং গবেষণায়। কিন্তু এসব আবিষ্কারের কথা
অপ্রকাশিতই ছিল পরবর্তী বাইশ বছর।
১৬৬৭ সালে আবার
কেমব্রিজে ফিরলেন নিউটন – অনেকটা আত্মবিশ্বাসী হয়ে। এবার একটা স্কলারশিপ পেলেন তিনি।
১৬৬৩ সালে কেমব্রিজে লুকাসিয়ান প্রফেসর পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। পার্লামেন্ট মেম্বার হেনরি
লুকাস এই পদের জন্য তদ্বির করেছেন এবং ১৬৬৪ সালে রাজা দ্বিতীয় চার্লস আনুষ্ঠানিকভাবে
হেনরি লুকাসের নামে এই পদের সূচনা করেন। প্রথম লুকাসিয়ান প্রফেসর হিসেবে নিয়োগ পেলেন
আইজাক ব্যারো। ব্যারো নিউটনকে খুবই পছন্দ করতেন। আইজাক ব্যারোর সংস্পর্শে এবং সহায়তায়
আইজাক নিউটন কেমব্রিজে স্থায়ী পদ লাভ করেন। ইতোমধ্যে তিনি ডিগ্রি অর্জন করে ফেলেছেন।
সেই সময় কেমব্রিজে ভর্তি হলেই একটা নির্দিষ্ট সময় পর ডিগ্রি দিয়ে দেয়া হতো। আইজাক ব্যারো
ট্রিনিটি কলেজের মাস্টার এবং রাজকীয় পদে অভিষিক্ত হবার পর লুকাসিয়ান প্রফেসরের পদটা
নিউটনকে দিয়ে দেন। নিউটন ১৬৬৯ সালে কেমব্রিজ
ইউনিভার্সিটির লুকাসিয়ান প্রফেসর পদে যোগ দেন। পরবর্তী ৩৩ বছর তিনি সেই পদে কাজ করেছেন
[২]।
১৬৮৪ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী
এডমন্ড হ্যালি, রবার্ট হুক এবং ক্রিস্টোফার রেন আলোচনা করছিলেন সূর্যের চারপাশে গ্রহগুলির
উপবৃত্তাকার কক্ষপথের পেছনে কী ধরনের বল কাজ করে সে সম্পর্কে। রবার্ট হুক মত দিলেন
বল যদি দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক হয়, সেক্ষেত্রে গতিপথ উপবৃত্তাকার হবে। এডমন্ড
হ্যালি কেমব্রিজে এসে নিউটনের সাথে দেখা করে গ্রহনক্ষত্রের গতি সম্পর্কে একই প্রশ্ন
করলেন। উত্তরে নিউটন বলেন যে তিনি বেশ কয়েক বছর আগেই এসব বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের উত্তর
খুঁজে বের করেছেন এবং প্রয়োজনীয় গাণিতিক সমীকরণও লিখে ফেলেছেন। উলসথর্প ম্যানর খামারবাড়িতে
বসে প্রায় বিশ বছর আগে নিউটন যে গবেষণা করেছিলেন সেগুলির কিছু অংশ দেখেই হ্যালি বুঝতে
পারলেন কী অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হাতে নিয়ে বসে আছেন নিউটন। তিনি নিউটনকে একপ্রকার
জোর করে রাজি করালেন তাঁর গবেষণা বই আকারে প্রকাশ করার জন্য। ১৬৮৫ ও ১৬৮৬ – এই দুই
বছর প্রচন্ড পরিশ্রম করে নিউটন পৃথিবী ও মহাবিশ্বের গতি ও বল সম্পর্কিত যুগান্তকারী
আবিষ্কারকে তিন খন্ডের একটি বিশাল গ্রন্থে রূপ দিলেন। তৈরি হলো ফিলোসফিয়া ন্যাচারালিস
প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা।
সেই সময় বিজ্ঞানের
প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা ছিল ল্যাটিন। প্রিন্সিপিয়াও লেখা হয়েছিল ল্যাটিন ভাষায়। নিউটন ইচ্ছে
করেই বইটাতে অনেক বেশি গাণিতিক সূত্র দিয়ে ভর্তি করে ফেলেন যেন খুব বেশি মানুষ এই বই
পড়ে বুঝতে না পারেন। তাঁর ধারণা ছিল – কেউ কিছু বুঝতে না পারলে সমালোচনাও করতে পারবে
না। তিনি সমালোচনা সহ্য করতে পারতেন না।
প্রথম খন্ডে
স্থান পেলো আদর্শ অবস্থায় গতির সূত্র এবং গাণিতিক বিশ্লেষণ। দ্বিতীয় খন্ডে রাখা হলো
তরলের প্রবাহজনিত গতি এবং বলের সমীকরণ। তৃতীয় খন্ডে স্থান পেলো মহাবিশ্বের গ্রহ-নক্ষত্র
এবং পৃথিবীর গতিপ্রকৃতি, মহাকর্ষ বল।
কথা ছিল রয়েল
সোসাইটির টাকায় এই বই প্রকাশিত হবে। কিন্তু দেখা গেল রয়েল সোসাইটি ইতোমধ্যেই প্রকাশনার
সব বাজেট খরচ করে ফেলেছে মাছ সংক্রান্ত বইয়ের প্রকাশনায়। তখন এডমন্ড হ্যালি সিদ্ধান্ত
নিলেন নিজের টাকায় এই বই প্রকাশ করবেন। তিনি নিজেই প্রুফ দেখলেন, বইয়ের সম্পাদনা করলেন,
এবং সম্পূর্ণ নিজের টাকায় রয়েল সোসাইটির ব্যানারে ১৬৮৭ সালে প্রকাশ করলেন নিউটনের
‘প্রিন্সিপিয়া’। প্রথম সংস্করণে আনুমানিক ছয় শ কপি ছাপানো হয়েছিল। [২০২০ সালের এক জরিপে
প্রথম সংস্করণের ৩৮৬ কপি বইয়ের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে পৃথিবীর বিভিন্ন লাইব্রেরিতে।]
নিউটনের জীবদ্দশায় প্রিন্সিপিয়ার আরো দুটো সংস্করণ প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত
হয়েছিল ১৭১৩ সালে (৭৫০ কপি) এবং তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৭২৬ সালে (১২৫০ কপি)।
প্রিন্সিপিয়ার
প্রথম ইংরেজি অনুবাদ ‘দ্য ম্যাথমেটিক্যাল প্রিন্সিপ্যালস অব ন্যাচারাল ফিলোসফি’ প্রকাশিত
হয় নিউটনের মৃত্যুর দুবছর পর ১৭২৯ সালে। ল্যাটিন থেকে সর্বপ্রথম ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন
অ্যান্ড্রু মোটে। তাঁর ভাই বেঞ্জামিন মোটে সেই বই প্রকাশ করেছিলেন। এরপর গত তিন শ
বছরে আরো অনেক পরিমার্জিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় [৩, ৪]।
বিংশ শতাব্দীতে
আপেক্ষিকতা ও কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আবিষ্কারের পর পারমাণবিক ও অতিপারমাণবিক স্কেলের
কণা ও তরঙ্গের গতি এবং বল নিউটনিয়ান মেকানিক্স – যা প্রিন্সিপিয়ার মূল বিষয় – দিয়ে
ব্যাখ্যা করা না গেলেও এখনো দৃশ্যমান ব্যবহারিক ক্ষেত্রে প্রিন্সিপিয়ার নীতিই প্রযোজ্য।
ভবিষ্যতেও নিউটনের মেকানিক্স সমানভাবেই ব্যবহৃত হবে – কারণ কোয়ান্টাম মেকানিক্সের করেসপন্ডেস
নীতি অনুসারে – বস্তুর গতি যখন আলোর গতির তুলনায় অনেক কম হয়, তখন কোয়ান্টাম মেকানিক্স
নিউটনিয়ান মেকানিক্সের নীতিকেই সমর্থন করে। ভবিষ্যতে চাঁদে ঘাঁটি স্থাপন, মঙ্গল অভিযানে
যাত্রাপথ নির্ধারণ কিংবা গ্রহাণু থেকে খনিজ আহরণের মতো মহাকাশভিত্তিক শিল্পেও কক্ষপথ
বলবিদ্যা ও গতি বিশ্লেষণের জন্য নিউটনীয় কাঠামোই প্রধান ভূমিকা পালন করবে। একই সঙ্গে,
প্রিন্সিপিয়া যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সূচনা করেছে—গণিত দিয়ে প্রকৃতির নিয়ম প্রকাশ ও ভবিষ্যদ্বাণী
করা—তা ভবিষ্যতের সব তাত্ত্বিক অগ্রগতির ভিত্তি হিসেবেই থেকে যাবে। মহাবিশ্বের প্রকৃতিকে
সঠিকভাবে বোঝার জন্য আমাদেরকে এই মহাবিশ্বের মহাগ্রন্থ প্রিন্সিপিয়ার স্মরণ নিতেই হবে।
তথ্যসূত্র
[১] স্টিফেন
হকিং ও ওয়ারনার ইসরায়েল সম্পাদিত ‘থ্রি হানড্রেড ইয়ারস অব গ্র্যাভিটেশান’, কেমব্রিজ
ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৮৭।
[২] প্রদীপ
দেব, বিজ্ঞানচিন্তা, আগস্ট ২০২১।
[৩] আইজাক নিউটন,
দ্য প্রিন্সিপিয়া, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া প্রেস, ১৯৯৯।
[৪] চন্দ্রশেখর
সুব্রাহ্মনিয়ান, নিউটন্স প্রিন্সিপিয়া ফর দ্যা কমন রিডার, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি
প্রেস, ১৯৯৫।





.jpg)

