বেশ কয়েকদিন ধরে একটানা পড়ে শেষ করলাম মহিউদ্দিন মোহাম্মদের পাঁচটি বই। কোনো একজন লেখকের প্রকাশিত ছয়টি বইয়ের মধ্যে পাঁচটি পড়ে ফেলা – কম কথা নয় আমার জন্য। বিশেষ করে যেখানে দীর্ঘদিন বাংলা পরিমন্ডলের বাইরে থাকলে – বাৎসরিক বইমেলা থেকে দূরে থাকতে হলে – বই তো দূরের কথা, বইয়ের খবরও যথাসময়ে এসে পৌঁছায় না।
হিশেব করে দেখা যাচ্ছে এই লেখকের প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছে ২০২২ সালে। কম সময়ের মধ্যেই তিনি বিপুলভাবে আলোচিত হয়েছেন। বাংলাদেশি পাঠকদের মধ্যে আলোচনায় কীভাবে থাকতে হয় তা তিনি ভালো করে জানেন বলেই মনে হলো তাঁর বইগুলি পড়ে।
কোনো বই পড়ে আমার নিজের কেমন লাগলো তা লিখে রাখি আমার নিজের জন্যই। কারণ আমার স্মৃতি খুব বেশিদিন সবল থাকবে এমন বিশ্বাস আমার নেই। মহিউদ্দিন মোহাম্মদের বইগুলি পড়েও কেমন লাগলো একে একে বলছি।
লেখক কোন্ লেখা কখন লিখেছেন তা নিজে না বললে অন্য কারো পক্ষে জানা সম্ভব নয়। কিন্তু পাঠক হিসেবে কোনো লেখকের যদি একাধিক বই হাতে আসে – আমি চেষ্টা করি প্রকাশকালের ক্রমানুসারে বইগুলি পড়তে। সেভাবেই শুরু করলাম ‘আধুনিক গরু-রচনা সমগ্র’ দিয়ে।
বই হাতে নিয়েই বুঝলাম আক্ষরিক অর্থেই বেশ মজবুত বই। শক্ত মলাট, মজবুত বাঁধাই, ঝকঝকে কাগজ। জ্ঞানকোষ প্রকাশনীর সব বইয়েরই অঙ্গসৌষ্টব এরকম জোরালো কিনা জানি না। তবে মহিউদ্দিন মোহাম্মদের সব বই বেশ সযত্নে প্রকাশিত। ভালো লাগলো আমাদের দেশের প্রকাশনা শিল্পের এই দিকটির উন্নতি দেখে।
‘আধুনিক গরু-রচনা সমগ্র’র যে সংস্করণটি আমি পড়লাম তা ষষ্ঠ সংস্করণ। ফেব্রুয়ারি ২০২২ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়ে ২০২৪ এর জুনে বইয়ের ষষ্ঠ সংস্করণ প্রকাশিত হওয়া সহজ ব্যাপার নয়। এতগুলি সংস্করণে কী কী সংস্কার করা হয়েছে তা লেখা থাকে প্রতিটি সংস্করণের ভূমিকায়। কিন্তু এই বইতে একটিই ভূমিকা আছে এবং সেটার সময়কাল দেখে বুঝতে পারি তা প্রথম সংস্করণের। বোঝার উপায় নেই সংস্করণ আর পুনর্মূদ্রণের মধ্যে আসলেই কোন পার্থক্য ছিল কি না।
উৎসর্গের পাতাতেই চমকে দিয়েছেন লেখক – বইটি আল্লাহকে উৎসর্গ করে। আল্লাহকে এর আগে আর কেউ কোন বই উৎসর্গ করেনি এমন নয়। তবে মহিউদ্দিন মোহাম্মদ যে যুক্তি দেখিয়েছেন – ‘কারণ তাঁর সাথে দ্বিমত পোষণ করা যায় না’ – তা অভিনব। কেন দ্বিমত করা যায় না – সে প্রশ্ন এখানে তোলা নিরর্থক, কারণ উৎসর্গের ব্যাপারটি লেখকের এতটাই নিজস্ব যে সেখানে পাঠকের কোন কিছু বলার থাকে না, বলা উচিতও নয়।
প্রকাশক শাহীদ হাসান তরফদার একটি দীর্ঘ ভূমিকা লিখেছেন এই বইয়ের। অবশ্য তার বেশিরভাগ পাতা জুড়ে আছে লেখকেরই দীর্ঘ কবিতা ‘মাংস নয়, হাড়ের মুক্তি চাই’। কবিতাটিও এই বইয়ের অংশ হয়ে উঠেছে যদিও বইটি লেখকের আধুনিক গদ্যের সংকলন।
প্রকাশক তাঁর কথার শুরুতেই লিখছেন, “মগজে গুঁতো খাওয়ার ভয়ে অনেকে মহিউদ্দিন মোহাম্মদের লেখা পড়তে চান না।“ খটকা লাগলো। এই বই যদি লেখকের প্রথম বই হয়, তাহলে পাঠকদের মগজে গুঁতো দেয়ার ব্যাপারটি লেখক কোথায় করলেন? হয়তো অনলাইনে কিংবা ফেসবুকে – যা সেইসময় আমার চোখ এড়িয়ে গেছে। বইতে যেসব বিষয়ে লেখা সংকলিত হয়েছে তার সবগুলিই সমসাময়িক, এবং ধারণা করা যায় তার কিছু কিছু হয়তো বইতে সংকলিত হবার আগে অন্য কোথাও প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু সে সম্পর্কে কোন তথ্য দেয়া হয়নি। প্রকাশক লেখক সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। কোনো বই সম্পর্কে সেই বইয়ে প্রকাশিত প্রকাশকের কিংবা আলোচকদের প্রশংসাবাণীতে খুব বেশি ভরসা রাখা যায় না। কারণ এই প্রশংসা মূলত ব্যবসায়িক। কোনো প্রকাশক নিশ্চয় তাঁর নিজস্ব প্রকাশনার কোন বই সম্পর্কে নিন্দা করবেন না। তবুও এটা ভালো লাগলো যে প্রকাশক তাঁর লেখকের বই প্রকাশ করার আগে পড়ে দেখেছেন। আমি বাংলাদেশের একাধিক প্রকাশককে গর্ব করে বলতে শুনেছি যে তাঁরা বই পড়তে পছন্দ করেন না। জ্ঞানকোষ প্রকাশনীর প্রকাশক সেরকম নন জেনে খুশি হলাম।
বইয়ের দুটি অংশ – সংজ্ঞাবলীর পদাবলী এবং সূর্যগ্রহণ। প্রথম একুশটি রচনা সন্নিবেশিত হয়েছে সংজ্ঞাবলীর পদাবলীতে এবং দশটি রচনা সন্নিবেশিত হয়েছে সূর্যগ্রহণ অংশে।
প্রথম অংশের লেখাগুলি সংক্ষিপ্ত কিন্তু জোরালো বক্তব্যের বারুদে ঠাসা। প্রসঙ্গ পরিচিত – কিন্তু উপস্থাপনার ভাষা নতুন এবং নিপুণ। ‘ভুঁড়ি হলো একজনের শরীরে বেড়ে ওঠা আরেকজনের মাংস’, ‘বাঙালি শব্দটির উৎপত্তি ঘটেছে ব্যাঙ থেকে’, ‘মানুষ প্রভুভক্তিতে কুকুরদেরও ছাড়িয়ে গেছে’, ‘প্রাণীদের মধ্যে একমাত্র গাধাই যুক্তিবাদী’, ‘শয়তান তার গাড়িতে বিশেষ স্টিকার লাগিয়ে রাখে। স্টিকারে লেখা থাকে – “শয়তান”, ‘সত্যকে ঢিল মারলে পাওয়া যায় লোভনীয় পুরষ্কার’, ‘সময়ই একমাত্র শিক্ষক, যিনি পাঠদান শেষে তার ছাত্রদের মেরে ফেলেন’, ‘কৃষক হলেন ধানক্ষেতের ক্রীতদাস’, ‘শিক্ষক হবো – এই স্বপ্ন এখন আর কেউ দেখে না’, - এসব বাক্য ঝকঝকে ছুটির ফলার মতো, যেমন চকচকে তেমনই ধারালো।
মানুষের বোধ জাগ্রত করাই লেখকের দর্শন, কিন্তু গতানুগতিক একঘেঁয়ে দার্শনিক তত্ত্বের বদলে তাঁর উপস্থাপনা ব্যতিক্রমী এবং আকর্ষণীয়। “সমাজকে যেদিন আমি একটি লাথি কম দিই, সমাজ সেদিন আপনাদের ঘাড়ে একটি কামড় বেশি দেয়।“
“তারুণ্যের প্রধান কাজ – বুড়ো মানুষের কর্তৃত্বকে অস্বীকার করা।“ যে সময়ে এই বাক্য রচিত হয়েছিল – তার তিন বছরের মধ্যেই যে তরুণরা অশীতিপর বুড়োদের ডেকে নিয়ে আসবে কর্তৃত্ব করার জন্য – তা কি লেখক জানতেন?
আধুনিক গরু-রচনা সমগ্রে সত্যি সত্যিই ‘গরু’ শিরোনামের একটি অভিনব রচনা আছে যেখানে বর্ণিত হয়েছে কঠিন সত্য – ‘ক্ষমতাহীন সকল প্রাণীই গরু’।
সবগুলি রচনাই সুখপাঠ্য, চিন্তা জাগানীয়া। লেখক এখানে সফল। যেসব কথা সরাসরি বলতে চাননি – রূপক ব্যবহার করে বলেছেন। “মুরগিদের নিয়ে অসুবিধা হলো – তারা তাদের জনসভায় সবসময় প্রধান অতিথি করে থাকে একজন শিয়ালকে।“ – পাঠকের বুঝতে অসুবিধা হয় না, মুরগি কারা, আর শেয়াল কোন্জন।
“বাদুড়ের দাঁত” রচনায় একটি তথ্যগত ভুল আছে। লেখক প্রচলিত বিশ্বাসকে তদন্ত না করেই লিখে ফেলেছেন “বাদুড় যে-পথে মলত্যাগ করে সে-পথেই খাবার গ্রহণ করে”। বাদুড় মাথা নিচু করে ঝুলে থাকে বলে অনেকেই মনে করে এরকম। আসলে বাদুড় স্তন্যপায়ী প্রাণীদের সব রকম শারীরিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রাণি। তাদের মলদ্বার আছে এবং মলদ্বার দিয়েই মল ত্যাগ করে, মুখ দিয়ে নয়।
সূর্যগ্রহণ পর্বের প্রবন্ধগুলি অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ। ‘মানুষ ও অন্ধকারের প্রশংসা’ নিজেই একটি স্বতন্ত্র বই হতে পারতো কয়েক ফর্মার। এই প্রবন্ধের মানুষগুলি মূলত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষ, যারা বিশ্বাস করে অলৌকিক ক্ষমতায়। বিভিন্ন ধরনের গোঁড়ামির গোলামি তারা করে ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায়। “যে সমাকে গোঁড়ারা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সে সমাজ চিলের সমাজ। ওখানে বাঁচতে হয় মুরগির ছানার মতো লুকিয়ে লুকিয়ে।“ কী চমৎকার সত্য বলেছেন আমাদের সমাজ সম্পর্কে আমাদেরই সমাজ থেকে মাথা তুলে দাঁড়ানো এই লেখক।
মানুষ সম্পর্কে লেখকের পর্যবেক্ষণ অসাধারণ। “মানুষ যে সম্পদ অর্জন করে, তার নব্বই শতাংশই সে ভোগ করতে পারে না। কিন্তু এই অতিরিক্ত সম্পদ অর্জন করতে গিয়ে হারিয়ে ফেলে মূল্যবান স্বাস্থ্য ও সুখ। সে বাঁচে পঞ্চাশ বছর, কিন্তু টাকা উপার্জন করে এক হাজার বছরের।“
এই লেখায় লেখক মানুষ হিসেবে নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা, এবং কোন কোন ক্ষেত্রে উন্নততর বলেও দাবি করেছেন। লেখক হিসেবেও নিজেকে অন্য লেখকদের চেয়ে ভালো দাবি করে লিখেছেন, “লেখক হিশেবে আমাকে যারা হিংসা করেন, তারা জানেন যে, তাদের চেয়ে আমার লেখার দীর্ঘায়ু হওয়ার সক্ষমতা বেশি।“ [পৃ ১২৪] এটিকে অহংকার বলবো কি না জানি না। কারণ এই দাবি বড়ই ব্যক্তি নির্ভর। তিনি কোন্ লেখকের সাথে নিজের তুলনা করছেন তা খোলাসা করেননি। প্রয়াত হুমায়ূন আজাদও যখন তখন নিজেকেই সেরা দাবি করতেন।
প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে লেখকের মন্তব্য খুবই বিরূপ এবং তীব্র। শিক্ষাকে তিনি রাজনীতির হাতিয়ার বলে মনে করেন। মনে করেন “জাতীয় সংগীত ধীরে ধীরে শিশুদের চিন্তা ও প্রতিবাদ করার শক্তি কেড়ে নেয়।“ কিন্তু তিনি যেভাবে বলেছেন জাতীয় সংগীতের কারণেই শিশুরা ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে , ভালো ও খারাপের মধ্যে, সত্য ও মিথ্যার মধ্যে, ঠিক ও ভুলের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না, তা কি পুরোপুরি ঠিক? জাতীয় সংগীতের ফলেই মানুষ হিসেবে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও চিন্তার স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে [পৃ ১৩৩] – তা কি অতিশয়োক্তি নয়?
বাংলাদেশের সরকারি স্কুলের শিশুপাঠ্য বইগুলির তীব্র সমালোচনা করেছেন লেখক। তা করতেই পারেন। তবে ঠিক কোন্ দেশের বইকে তিনি আদর্শ বই বলে মনে করেন তা বোঝা গেল না। বইগুলির লেখক সম্পাদকদের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে বিভিন্ন অপমানজনক বিশেষণ প্রয়োগ করে কঠোর ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছেন (পৃ ১৪৯) যা সুরুচির পরিচয় বলে আমার মনে হয়নি।
জিপিএ ফাইভ ও জুতোর ফ্যাক্টরি প্রবন্ধে প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতি এবং গ্রেডিং সিস্টেমকে তুলোধুনা করেছেন লেখক। লিখেছেন, “কিছু কাগজ ও চকের ধুলো ছাড়া এ পদ্ধতিতে শিক্ষক ও ছাত্রের মাঝে আর কিছুর বিনিময় ঘটে না।“ [পৃ ১৬৭]। কিন্তু আদর্শ পদ্ধতি বলে কি কিছু আছে? যদি না থাকে, তাহলে কিসের ভিত্তিতে কোন পদ্ধতিকে ভালো কিংবা খারাপ বলা হবে – সে প্রশ্ন লেখক এড়িয়ে গেছেন।
লেখক গবেষণার প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি – পিএইচডির উৎপত্তির ইতিহাস এবং পিএইচডি ডিগ্রি সম্পর্কে অত্যন্ত ঋণাত্মক মতবাদ দিয়েছেন “ছাগল ও তার পিএইচডি ডিগ্রি” প্রবন্ধে। বাংলাদেশের অনেকে টাকা দিয়ে এই ডিগ্রি নিয়েছেন, অন্যের লেখা নকল করে থিসিস লিখেছেন এরকম কলংকের আলোকে এরকম সমালোচনা করার যুক্তি লেখকের আছে। কিন্তু ঢালাওভাবে ডিগ্রিটাকেই অদরকারি বলে ফেললে অতিরিক্ত বলা হয়ে যায়।
‘আমাদের ইশকুল, আমাদের গোরস্থান’ রচনায় লেখক কীরকম স্কুল চান, কেমন স্কুল আদর্শ স্কুল তার কিছুটা বর্ণনা দিয়েছেন। বলেছেন বাংলাদেশে যে স্কুলিং প্রথা চালু আছে তা পুরোপুরি বদলে ফেলতে হবে। “বর্তমান ইশকুলগুলোকে বিক্রি করে, অথবা ভেঙে ফেলে, নতুন ইশকুল নির্মাণ করা”- যাতে শিশুরা স্কুলে যেতে আনন্দ পায়। ভালো স্কুল এবং স্কুলিং বোঝানোর জন্য লেখক অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের একটি স্কুল পরিদর্শন করার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। ঘটনাচক্রে আমি অনেক বছর থেকে এই শহরটিতে থাকি এবং এদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সাথে আমার কিছুটা পরিচয় আছে। সে সূত্রে আমি বলতে পারি লেখক মেলবোর্নের শিক্ষাব্যবস্থাকে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সাথে তুলনায় এগিয়ে রাখতে গিয়ে একটু বেশি প্রশংসা করে ফেলেছেন। লেখক ঠিক কী হিসেবে মেলবোর্নের বিদ্যালয় পরিদর্শন করলেন এবং প্রিন্সিপাল তাঁকে এত দীর্ঘ সময় নিয়ে সবকিছু দেখালেন – তা পাঠকদের বললে বুঝতে সুবিধা হতো। বলাবাহুল্য মেলবোর্নের সরকারি স্কুলের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমরাও এখানে উদ্বিগ্ন। এখানকার স্কুলের শিক্ষকরা এত কম বেতন পান যে – সুযোগ পেলেই শিক্ষকতা ছেড়ে অন্য কোন পেশায় চলে যান এখানকার শিক্ষকরা।
বাংলাদেশের এক শ্রেণির মানুষ এখনও মনে করে নারীর পোশাকের কারণেই ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটছে সেখানে। অথচ ঘটনা বিশ্লেষণ করলে এর পক্ষে কোন সুযুক্তি পাওয়া যায় না। লেখক এসমস্ত ব্যাপারের যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন “ধর্ষণের সাথে পোশাকের সম্পর্ক” প্রবন্ধে। “ধর্ষণ তখনই ঘটে, যখন ধর্ষক বুঝতে পারে যে ধর্ষণ করার পরও সে নিরাপদে থাকবে। এ জন্য সে প্রথমেই যাকে ধর্ষণ করবে তার ক্ষমতা মেপে নেয়“ [পৃ ২০৪]। “বাংলাদেশে এই মুহূর্তে যে ক্ষমতা কাঠামো আছে, তাতে একজন মন্ত্রীর মেয়ের ধর্ষিত হওয়ার সম্ভাবনা, একজন কৃষকের মেয়ের ধর্ষিত হওয়ার সম্ভাবনার চেয়ে অনেক কম” [পৃ ২০৫]। খুবই নির্মম সত্য কথা। কিন্তু মাঝে মাঝে কিছু ব্যতিক্রমও কেন ঘটে যায়, যেমন ১৯৯৮ সালে ঘটা শাজনীন হত্যার ঘটনা, তার ব্যাখ্যা মেলে না।
“আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েরা” রচনায় যৌক্তিকভাবেই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের সমালোচনা করেছেন লেখক। সংগতকারণেই জোরালো শ্লেষাত্মক প্রশ্ন করেছেন, “একটি সেতু নির্মাণ করতে রাষ্ট্র খরচ করেছে চল্লিশ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জন্য এক থালা ভালো ভাত ও একটি ভালো কক্ষের ব্যবস্থা রাষ্ট্র করতে পারেনি [পৃ ২২১]”।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সমালোচনা করার ক্ষেত্র তৈরি করার উদ্দেশ্যে লেখক তাইওয়ানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ ঔদার্যপূর্ণ সুনাম করেছেন লেখক। বিদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেলে কিংবা হঠাৎ দেখতে গেলে সবকিছু সুন্দরই মনে হয়, ফাঁকফোকরগুলি চোখে পড়ে না। ওখানেও যে অনিয়ম – বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম মাত্রার হলেও – চলে তা হঠাৎ দেখায় দেখা যায় না। উন্নত দেশের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে যে পরিমাণ বেতন দিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়তে হয়, সেই তুলনায় আমাদের দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি মোটামুটি অবৈতনিক – এটি অস্বীকার করলে অন্যায় করা হয়।
সবশেষের অধ্যায় “আঠারোটি পাউরুটি” আসলে হুমায়ূন আজাদের প্রবচনগুচ্ছের অনুকরণে আঠারোটি প্রবচন। যার আঠারো নম্বর “আইন জিনিসটি বেশ অদ্ভুত। যেমন – রাস্তায় কুকুর হিস্যু করতে পারবে, কিন্তু মানুষ থুথু ফেলতে পারবে না।“ – ঠিক কী কারণে এটি বলা হলো বুঝতে পারলাম না। লেখক কি মানুষের রাস্তায় থুথু ফেলার অধিকার চাচ্ছেন?
সব মিলিয়ে বলতে গেলে বলা যায় – বেশ ভালো লেগেছে মহিউদ্দিন মোহাম্মদের আধুনিক গরু-রচনা সমগ্র। লেখকের ভাষা চমৎকার, বক্তব্য পরিচ্ছন্ন। বইয়ের সম্পাদনায় কিছু ত্রুটি আছে, মনে হয়েছে যা কিছু লেখা হয়েছে সবই বইতে ঠেসে দিয়ে দেয়া হয়েছে – তাই কিছু কিছু জায়গা খাপছাড়া লেগেছে।
লেখক পরিচিতিতে এসে লেখক নিজের ছবির বদলে তাঁর মায়ের ছবি দিয়েছেন। আর বলেছেন লেখকের পরিচয় তাঁর লেখা থেকেই খুঁজে নেয়া উচিত। তিনি কী কী ডিগ্রি অর্জন করেছেন, কী করেন তাতে কিছুই যায় আসে না। এক্ষেত্রে লেখকের সাথে আমি দ্বিমত পোষণ করতে বাধ্য হচ্ছি। লেখক যদি সৃজনশীল কোন সাহিত্য রচনা করেন তাতে তাঁর ভাষা এবং শৈল্পিক নির্মাণদক্ষতাই তাঁর পরিচয়। সেখানে তাঁর নামও যদি না থাকে কোন সমস্যা হয় না। অনেকেই ছদ্মনামে লেখেন। জেন অস্টিনের সবগুলি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর নাম ছাড়াই। তাতে কারো কোন সমস্যা হয়নি। কিন্তু লেখক যখন প্রবন্ধ লেখেন, বিজ্ঞান লেখেন, দর্শন লেখেন, এবং লেখায় নিজের সম্পর্কে কোনো কিছু দাবি করেন – পাঠকের অধিকার জন্মায় সেগুলির সত্যতা যাচাই করে দেখার। লেখক যদি জ্ঞান দেন, পাঠকের অধিকার আছে যাচাই করে দেখার যে লেখকের জ্ঞান দেয়ার যোগ্যতা কীভাবে অর্জিত হয়েছে। মহিউদ্দিন মোহাম্মদ তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় হিসেবে যেসব কথা লেখার মধ্যে লিখেছেন – যেমন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত উপার্জন করা তিনি বন্ধ করে দিয়েছেন [পৃ ৯০], লুঙ্গি পরে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন, বিমানে উঠেছেন [পৃ ৯২], ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লাল প্যান্ট পরে যেতেন [পৃ ৯৪], শৈশবে মাদ্রাসায় পড়েছেন [পৃ ৯৭] – এগুলির সত্য-মিথ্যা কীভাবে প্রমাণিত হবে যদি মূল পরিচয় গোপন করা হয়?
No comments:
Post a Comment