___________________________
টয়োটা করোলা ।। মহিউদ্দিন মোহাম্মদ ।। জ্ঞানকোষ প্রকাশনী ।। প্রকাশকাল জানুয়ারি ২০২৩ ।। প্রচ্ছদ - সব্যসাচী মিস্ত্রী ।। মূল্য ২৮০ টাকা ।। ১০৪ পৃষ্ঠা।।
____________________________
মহিউদ্দিন মোহাম্মদের মুক্তগদ্যের প্রথম সংকলন ‘আধুনিক গরু-রচনা
সমগ্র’ পড়ার সময় তাঁর শক্তিশালী গদ্যে মুগ্ধ হয়েছি। তাই জ্ঞানকোষ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত
তাঁর দ্বিতীয় বই ‘টয়োটা করোলা’র প্রতি প্রত্যাশা ছিল আরো বেশি। তেরোটি নাতিদীর্ঘ গল্পের
সংকলন ‘টয়োটা করোলা’। আমি সাহিত্যের প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্র নই, সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ
আছে – আনন্দের জন্যই আমি সাহিত্য পড়ি। তাই সাহিত্যের শাখাপ্রশাখার খটমট সংজ্ঞা নিয়ে
আমার তেমন কোন মাথাব্যথা নেই। ছোটগল্পের সংজ্ঞা কী? ছোটগল্প হয়েছে কি না দেখার জন্য
রবীন্দ্রনাথের “ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা, ছোট ছোট দুঃখ কথা, নিতান্তই সহজ সরল“ জাতীয় বৈশিষ্ট্যগুলি
মিলিয়ে দেখার কোন দরকার আছে বলে আমি মনে করি
না। “নাহি বর্ণনার ছটা, ঘটনার ঘনঘটা, নাহি তত্ত্ব, নাহি উপদেশ। অন্তরে অতৃপ্তি রবে,
সাঙ্গ করে মনে হবে, শেষ হইয়াও হইল না শেষ।“- মিলিয়ে নিতে গেলে দেখা যাবে এই বইয়ের সবগুলি
গল্পেই বর্ণনার ছটার ছড়াছড়ি, ঘটনার ঘনঘটাও কম নয়। আর তত্ত্ব এবং উপদেশ তো আছেই। তবুও
লেখার গুণে এই তেরোটি রচনাই আলাদা আলাদা ছোটগল্প হয়ে উঠেছে।
প্রথম গল্প “একটি পুকুর কী বলিতে চায়?” পড়ার সময় রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুরের “ঘাটের কথা” মনে পড়ে যায়। ভাষাগত শুধু নয়, আবহও একই রকমের। শুধু সেকাল আর একালের
পার্থক্য। অবশ্য লেখক নিজেও এটা স্বীকার করেছেন বইয়ের ভূমিকায়। আত্মপক্ষ সমর্থনে বলেছেন,”রবীন্দ্রনাথ
ব্যবহার করেছেন তাঁর নিজের সময় ও সমাজকে, আর আমি ব্যবহার করেছি পুরো একুশ শতকের সময়
ও সমাজকে।“ রবীন্দ্র-আশ্রিত এই রচনাকে তাই পুরোপুরি মৌলিক রচনা বলা যাচ্ছে না। তবুও
কিছু কিছু বাক্যে বিদ্যুৎ চমকায় – যেমন, “সূর্যেরও কী দয়া, নিজ হাতে মেঘ পরিষ্কার করিয়া
তাহাদিগকে খরতাপ বিলাইয়া যাইতো।“ [পৃ ২৫]।
একটি পুরনো মসজিদের আত্মকথা ‘মসজিদের চিঠি’। কাল্পনিক এই
চিঠিতে মসজিদের জবানিতে লেখক ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে বেশ কিছু সাহসী বাক্য উচ্চারণ করেছেন
যেগুলি আমাদের বর্তমান সমাজের দুঃখজনক অথচ সঠিক প্রতিফলন। “ইউটিউবে ওয়াজ শুনিয়া আপনাদের
মাথা খারাপ হইয়া গিয়াছে। নানা আনর-বানরের কথা শুনিয়া ইহুদিদের বকাবকি করিতেছেন, বৌদ্ধদের
বংশচয়নিকা উদ্ধার করিতেছেন। গত শুক্রবার এক ফেসবুক পোস্ট পড়িয়া মিছিল লইয়া ছুটিয়া গেলেন
শান্তিপুর গ্রামে, গিয়া জ্বালাইয়া দিলেন আট-দশটি হিন্দু ঘরবাড়ি।“ [পৃ ২৮]। “ধীরে ধীরে
নবীর উম্মত হইতে খারিজ হইয়া আপনারা সমাজের উম্মতে পরিণত হইতেছেন। আল্লাহর নামে কোরবানি
দেওয়ার কথা বলিয়া সমাজের নামে কোরবানি দিতেছেন। সমাজকে ভয় পাইয়া শুক্রবারে নামাজ পড়িতেছেন।“
[পৃ ৩০]। শুধুমাত্র হিন্দু পরিচয়কে প্রাধান্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের বই মসজিদের
লাইব্রেরি থেকে বাতিল করে দেয়ার ঘটনারও সমালোচনা করেছেন লেখক। বর্তমান বৈরি সময়ে এটুকু
করতেও অনেক বেশি সৎ সাহস লাগে। লেখক সে সাহস দেখাতে পেরেছেন।
‘দেশটি নষ্ট হইয়া গেলো’ গল্পটি বাংলাদেশের একদিন প্রতিদিনের
সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরগুলিকে কেন্দ্র করে লেখকের ধারাবাহিক সমালোচনা। বাংলাদেশে প্রতিদিন
এতবেশি আজেবাজে ঘটনা ঘটে যে সেগুলি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলে লেখকের মতে তা একটা ময়লার
গাড়ির মতো মনে হয়। তাই লেখক সংবাদপত্রের নাম দেন ‘ময়লাপত্র’। সমাজের নানা দুর্নীতি,
অন্যায়-অনাচার প্রতিদিন দেখতে দেখতে মানুষ এতই অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে তাতে কারোরই মনে
হয় না দেশ নষ্ট হয়ে গেলো। কেবল কোন মেয়ে যদি একটু সাহসী পোশাক পরে রাস্তায় বের হয় সাথে
সাথে সবাই চিৎকার দিয়ে ওঠে – দেশটি নষ্ট হয়ে গেল। লেখকের সমাজ-পর্যবেক্ষণের এখানে প্রশংসা
করতেই হয়।
‘মানুষ ও বানরের পার্থক্য’ গল্পের নায়ক যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
থেকে প্রাণিবিজ্ঞানে অনার্স-মাস্টার্স করে একটি ব্যাংকে আশি হাজার টাকা বেতনে কর্মরত।
একদিন নায়ক কোনো এক জঙ্গলে হারিয়ে গিয়ে জঙ্গলের বানরের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারেন
মানুষ ও বানরের মধ্যে আসল পার্থক্য কী। এখানে মানুষ ও বানরের জীববিজ্ঞানিক পার্থক্যের
চেয়েও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মানুষের লোভ এবং অন্যায়ের প্রতি সীমাহীন আনুগত্যের প্রতি
লেখকের তীব্র শ্লেষ। “কিছু কিছু রূপক ও বাক্যবিন্যাস
অপূর্ব। উদাহরণ – ‘ছড়িটিতে তিনটি পাকা কলা রোদের ঘষা খাইয়া চকচক করিতেছে।“ [পৃ ৪০]।
“যেন চাঁদের আলো পাইয়া কোনো দীঘির জল মোমবাতির মতো গলিয়া পড়িতেছে।“ [পৃ ৪১]।
বাংলাদেশের এক শ্রেণির পুরুষ নারীদের ভীষণ অসম্মানের চোখে
দেখে। ওয়াজ মাহফিল থেকে অপমান করে নারীদের বের করে দেয়া হয়। এরকম সমাজের নানাস্তরে
নারীর অপমানের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদী গল্প ‘ভণিতা’। সোজাসুজি বলা যায়, এই গল্পে
লেখকের বক্তব্য – আমাদের অনেকেরই বক্তব্য – যেখানে কোন ভণিতা নেই। কয়েকটা উদাহরণ দিই
– “শূকর যেমন ময়লাভান্ডে হঠাৎ গোলাপের দেখা পাইলে আঁতকিয়া ওঠে, ইহারাও তেমনি স্বসৃষ্ট
মলের ভাগাড়ে কোনো সৌন্দর্যের দেখা পাইলে পাগলা কুত্তা হইয়া ছোটে।“ [পৃ ৪৬]। “মনে হইতেছে,
লজ্জাদেবী ট্রেন দুর্ঘটনায় দুই পা হারাইয়া ভগিনীকুলের স্কন্ধে খুব শক্ত করিয়া চাপিয়া
বসিয়াছেন। ওইদিকে গৌরবপুত্ররা, ঢিলা-কুলুপ লইয়া, লুঙ্গি উঁচা করিয়া পথেঘাটে নাচানাচি
করিতেছে, বিড়ি টানিতেছে, শিস মারিতেছে, এবং রাস্তায় কোনো মেয়েলোকের দেখা পাইলে উঁহু
শব্দে উচ্চারণ করিতেছে: শালী এই সন্ধ্যাবেলা একা একা কোথায় যায়?” [পৃ ৪৭]। “এ আসমানী
দ্বিপদমন্ডলী চারপাশে উলঙ্গ নারী আবিষ্কার করিতেছে। দৃষ্টি-অভেদ্য জিন্স-প্যান্ট টি-শার্ট
সালওয়ার-কামিজ ভেদ করিয়া নারীকুলের সর্বাঙ্গ দেখিতেছে। বোধ হইতেছে, ইহারা জোঁকের চোখ
লইয়া জন্মাইয়াছে। জোঁক তা-ও মুখ লাগাইয়া রক্ত চোষে, কিন্তু এই নারীকাতর নেমাটোডগণ চোখ
লাগাইয়াই সর্বস্বাদ লুটিয়া লয়।“ [পৃ ৪৮]
ধর্ম এবং ঈশ্বরের ব্যাপারে নেতিবাচক মন্তব্য করা তো দূরের
কথা, যৌক্তিক সমালোচনা করলেও সমূহ বিপদ বাংলাদেশে। মুক্তচিন্তার একটি ঢেউ খেলেছিল বাংলাদেশে
বছর দশ আগে। মুক্তচিন্তকদের অনেককেই নৃশংসভাবে
খুন করা হয়েছে, বেশিরভাগকেই করা হয়েছে ঘরছাড়া, দেশছাড়া। সেখানে সরাসরি ঈশ্বরের সমালোচনা
করা কিংবা বিরোধিতা করা এখন মারাত্মক বোকামি। “ঈশ্বরের টেলিফোন”-এ লেখক সেই ভুল করেননি।
তিনি ঈশ্বরের কাল্পনিক টেলিফোনে ঈশ্বরের মুখ দিয়েই বলিয়ে নিয়েছেন বাংলাদেশের ধর্মান্ধ
মানুষ ঈশ্বরের নামে কীসব কুকীর্তি করে বেড়াচ্ছে। দুটো উদাহরণ উল্লেখ করা যাক। “কিছু
নফর আমাকে দানব সাজাইয়াছে। নিজেদের প্রতিশোধপরায়ণতা আমার ওপর আরোপ করিয়াছে। ভাবিতেছে,
তাহাদের শত্রু নিশ্চয়ই আমারও শত্রু। মূলত এরা নিষ্ঠুর বলিয়াই কল্পনা করিয়াছে আমিও নিষ্ঠুর।“
[পৃ ৫২] “আমি নাকি নারীদিগকে সর্বদা হাত, মুখ, চোখ ঢাকিয়া চলিবার নির্দেশ দিয়াছি! একটি
নারী নিজেকে লুকাইয়া রাখিলে উহাতে ঈশ্বরের কী সুবিধা হয়, তাহা বুঝিতে পারিলাম না। মনে
হয় গোলামেরা নিজেদের সুবিধার কথা ভাবিয়াই এ রূপ হুকুম আমার নামে জারি করিয়াছে।“ [পৃ
৫৩]। গল্পচ্ছলে লেখক ধর্মান্ধতার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন ঈশ্বরে পরিপূর্ণ বিশ্বাস রেখেই।
তবে তিনিও ঈশ্বরকে খুবই অসহায় এক স্বত্ত্বা হিসেবে চিত্রায়ন করেছেন – যে ঈশ্বরের ক্ষমতা
নেই তার বান্দাদের বদমায়েশি বন্ধ করার, কেবল টেলিফোন করে নিজের সাফাই গাওয়া ছাড়া।
মোসায়েবি বাংলাদেশে এক ছোঁয়াচে রোগের নাম। কোনো এক অজানা
কারণে এদেশের মানুষের মজ্জাগত বৈশিষ্ট্যে দাঁড়িয়ে গেছে মোসায়েবি। নিজের চেয়ে যেকোনোকিছুর
মাপকাঠিতে একটু উঁচু কাউকে দেখলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মোসায়েবি শুরু হয়ে যায়। কে কত শৈল্পিকভাবে
এই কাজটি করতে পারে তারই যেন প্রতিযোগিতা চলে বাংলাদেশে। ভয়াবহ রকমের দুর্নীতিপরায়ণ
স্বৈরাচারী সরকারকেও তেল দেয়ার প্রতিযোগিতা চলে সর্বত্র। এই দগদগে সমস্যাটির আংশিক
প্রতিফলন ঘটেছে ‘দরখাস্ত’ গল্পে যেখানে জনৈক আলি কামাল বর্ণনা দেন কত নির্লজ্জভাবে
তিনি সরকারকে তেল দিতে পারবেন যদি তেল মারার দায়িত্ব পান।
‘আমাদের দাদী’ গল্পে বাস্তবের সাথে কিছুটা পরাবাস্তব কল্পনা
[দাদী চাঁদের বুড়িকে বলে মেঘ সরিয়ে দিতেন…] মিশিয়ে বেশ কিছু আপ্তবাক্যের সমন্বয় ঘটিয়েছেন
[স্বর্ণ মূল্যবান, এ বিশ্বাস ঝেড়ে ফেলে দিলে পিতলের সাথে স্বর্ণের আর কোনো পার্থক্য
থাকে না। স্বর্ণ দামি, এ কথা প্রচার করে একদল চতুর তোমাদের কাছ থেকে সম্পদ হাতিয়ে নিচ্ছে।]।
গল্পের দাদীর উচ্চমার্গের দর্শনের সাথে কোনো তর্ক চলে না।
বইয়ের অন্যান্য গল্পগুলির তুলনায় বেশ দীর্ঘ গল্প ‘পাখির বাসা’।
কোনো এক রমজান মাসে কোনো এক বাড়ির ছেলেরা তাদের বাড়ির ছোট্ট আমগাছে একটি পাখির বাসা
আবিষ্কার করে। তারপর পাখিদের ঘিরে মানুষের জীবনের নানারকম ঘটনার দার্শনিক বিশ্লেষণ।
“আমাদের শিশুরা, আমাদের বুড়োরা, কখন যে বন্দুকের ভক্ত হয়ে গেলো, আমরা টেরই পেলাম না।
একটি বইয়ের চেয়ে একটি বন্দুক তাদেরকে বেশি উত্তেজনা দেয়। আকাশে ঘুড়ি দেখে এখন আর কেউ
খুশি হয় না। শিশুরাও বুঝে গেছে, বন্দুকই আসল।“ [পৃ ৬৯]। “মানুষ কিছুতেই তার জন্মদিনের
কথা মনে করতে পারে না। হয়তো এ শোকেই সে ঘটা করে জন্মদিন পালন করে।“ [পৃ ৭৫]। বর্ণনা
শৈল্পিক হলেও মাঝেমাঝে ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। কমলকুমার মজুমদারের ‘সুহাসিনীর পমেটম’-এর কথা
মনে পড়ে।
বাংলাদেশের কাঠমোল্লারা দিনরাত বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার
করে। মাঝে মাঝেই ঘোষণা দেয় বিজ্ঞান বর্জনের। গলা ফুলিয়ে বিজ্ঞানের বিরোধিতা করে আবার
একই গলায় ঘোষণা করে বিজ্ঞানের সব আবিষ্কার তাদের ধর্মের পবিত্র বই থেকেই হয়েছে। এসংক্রান্ত
অনেক শক্তিশালী গদ্য রচিত হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায়। ‘বিজ্ঞান ছাড়া একদিন’ গল্পে
লেখক সুনিপুণভাবে এঁকেছেন ধার্মিক আলিম মিয়ার বিজ্ঞান ব্যবহার না করে একটা দিন কাটাবার
নিষ্ফল চেষ্টার রেখাচিত্র। “টাইলসের মেশিন নিশ্চয়ই কোনো ইহুদির বাচ্চা তৈরি করেছে।
ওই ইহুদির বাচ্চা মহা ইবলিশ। মসজিদে মসজিদে সে টাইলস ঢুকিয়ে দিয়েছে। সবার নামাজ সূক্ষ্মভাবে
বরবাদ করে দিচ্ছে।“ [পৃ ৭৯] বিজ্ঞানছাড়া একটি দিনও কাটাতে ব্যর্থ হয়ে আলিম মিয়ার বোধোদয়
হয়, “ধর্মগ্রন্থ কোনো বিজ্ঞানগ্রন্থ নয়। মানুষ হীনম্মন্যতা থেকে ধর্মগ্রন্থকে বিজ্ঞানগ্রন্থ
দাবি করে থাকে। পৃথিবীতে যখন কোনো কোরান শরীফ ছিলো না, তখনও বিজ্ঞান ছিলো। মানুষের
মাঝে বৈজ্ঞানিক চিন্তার চর্চা ছিলো।“ [পৃ ৮২] লেখককে ধন্যবাদ গল্পের ভেতর হলেও এই সত্যি
সোজাসুজি বলার জন্য।
জাপানের একটি টয়োটা করোলা গাড়ির বাংলাদেশে গিয়ে কী কী অবস্থার
ভেতর দিয়ে যেতে হয় – তারই একটি সকৌতুক বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে ‘টয়োটা করোলা’ গল্পে।
গাড়ি যদি কথা বলতে পারতো এরকমভাবেই বলতো। “টোকিওতে দেখিতাম, অফিসগুলোতে কেবলই সেবা
উৎপাদন হইতো; আর এখানে দেখিতেছি, প্রতিটি অফিসেই রাতদিন টাকা উৎপাদন হইতেছে। কিন্তু
এত টাকা উৎপাদন করিয়াও দেশটির টাকার অভাব কেন ঘুচিতেছে না, এ উত্তর খুঁজিয়া পাইলাম
না।“ [পৃ ৮৮] বাংলাদেশের দায়িত্বজ্ঞানহীন পথচারীদের চরিত্রও ফুটে উঠেছে গাড়ির দৃষ্টিতে
– “পথচারীদের কথা কী বলিবো! মশা যেমন কামড় মারিবার সময় কাহারও ঘুমের তোয়াক্কা করে না,
এই পঙ্গপালেরাও তেমনি রাস্তা পার হইবার সময় নিজের জীবনের কোনো পরোয়া করে না। দৌড় মারিয়া,
হেলিয়া দুলিয়া, কতো কসরত ও নাটক করিয়া যে ইহারা রাস্তার এ পাড় হইতে ওই পাড়ে যায়, তাহা
বর্ণনা করিতে গেলে কয়েক দিস্তা কাগজ লাগিবে।“ [পৃ ৯০] “পায়ে হাঁটা দূরত্বেও গাড়ি-রিকশা
ব্যবহার করিতেছে। পরিণামে অল্পদিনেই মোটাসোটা হইয়া ডায়াবেটিস বাঁধাইয়া অকেজো মাংস রূপে
অন্ধকার ঘরে লুটাইয়া পড়িতেছে।“ [পৃ ৯১]
‘জার্নি বাই বাস’ গল্পটিকে প্রেমের গল্প বলে পরিচয় করিয়ে
দিয়েছেন প্রকাশক বইয়ের শুরুতে ভূমিকায়। বাস ভ্রমণে সহযাত্রীর প্রেমে পড়ে যাওয়ার ঘটনা
গল্পে নতুন নয়। এরকম গল্প হাজার জন হাজারবার লিখেছেন এর আগে। কিন্তু এই গল্পের বিবরণে
নিজের তারুণ্যের সময়ে বাংলা সিনেমা দেখার কিছু উদাহরণ দেখে নস্টালজিক হয়ে পড়েছিলাম।
“নায়ক্ জসিম যে-কালে উপর্যুপরি লটারি জিতিয়া ভ্যানচালক হইতে আচমকা কোটিপতি পদে উন্নীত
হইতো, বাড়িগাড়ি করিয়া আসমানে হুলস্থুল ফেলিয়া দিতো …” [পৃ ৯৩] নায়িকার দৃষ্টি আকর্ষণ
করার আগ্রহে নিজের পদার্থবিজ্ঞানের জ্ঞান জাহির করার উদ্দেশ্যও কেমন যেন পরিচিত মনে
হলো – “একবার ভাবিলাম, মোবাইল কানে লাগাইয়া ফেইক-কলে কাহারও সাথে কোয়ান্টাম মেকানিক্স
লইয়া আলাপ করি। আবার ভাবিলাম, জেনারেল রিলেটিভিটির কোনো ইউটিউব ভিডিও ফুল ভলিউমে ছাড়িয়া
দিই।“ [পৃ ৯৫]
বইয়ের শেষ গল্প ‘ড্রাইভিং লাইসেন্স’। বাংলাদেশে একটি ড্রাইভিং
লাইসেন্স পাবার জন্য কী কী করতে হয় তা আমার ছিল না। কিন্তু এই গল্প পড়ে আঁৎকে উঠেছি
বিআরটিএ নামক প্রতিষ্ঠানটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুষ খাওয়ার আয়োজন দেখে। শুধু তাই নয়, গল্পের
ভেতরই মারাত্মক প্রশ্ন উঠে এসেছে – “গাড়ি চালাইতে লাইসেন্স লাগিলেও দেশ চালাইতে কোনো
লাইসেন্স লাগে না। একটি ছোট চার চাকার যান চালাইতে এত টেস্ট, এত আয়োজন, অথচ এমন বিশাল
দেশখানা যাহারা চালাইতেছে, তাহাদিগকে কোনো পরীক্ষার ভেতর দিয়া যাইতে হইতেছে না। দেশের
স্টিয়ারিংয়ে বসিবার যোগ্যতা তাহাদের আছে কি না, দেশটি খাদে পড়িলে টানিয়া তুলিবার কৌশল
তাহারা জানে কি না, এ সত্য যাচাই না করিয়াই রাষ্ট্ররূপী গাড়িটিকে মন্ত্রী নামক ড্রাইভারদের
হাতে তুলিয়া দেওয়া হইয়াছে।“ [পৃ ১০২]
ভাষাশৈলীর কারণে প্রত্যেকটি গল্পই উপভোগ্য এবং ভাবনা জাগানিয়া
– এবং লেখক সেকারণেই সার্থক। তবুও বইয়ের শুরুতে প্রকাশকের কথা এবং লেখকের কথা নিয়ে
দুএকটি কথা না বললে নিজের অনুভূতির সাথে প্রতারণা করা হবে।
প্রকাশকের কথায় জ্ঞানকোষ প্রকাশনীর প্রকাশক শাহীদ হাসান তরফদার
ডক্টর আশিষ পালের জবানিতে লিখেছেন, “বাংলা সাহিত্য রবীন্দ্রনাথে থেমে আছে, এ কথাটি
আজ এই পাণ্ডুলিপি পড়ে আমার ভেতর থেকে দূর হয়ে গেল।“ ডক্টর আশিষ পাল সম্ভবত এই বইয়ের
পাণ্ডুলিপি যে কজন পড়েছেন তাঁদের একজন। তাঁর লেখা কিছুই আমি পড়িনি। তাঁর সাহিত্যবিবেচনাবোধ
সম্পর্কেও আমার কোন ধারণা নেই। কিন্তু তিনি যদি এই বইকে রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী অন্যসব
রচনার উর্ধ্বে স্থান দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সমকক্ষ বলে থাকেন, তাহলে তাঁর বিবেচনাবোধে
আমার আস্থা নেই। প্রকাশক পাঠকদের সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন – “অনেক কাঁচা পাঠক আছেন,
যারা নাম পুরুষে বর্ণনা করা গল্পের ভাষ্যকারের কন্ঠকে লেখকের নিজস্ব প্রাবন্ধিক কন্ঠ
মনে করে তালগোল পাকাতে পারেন।“ – তার কি কোন দরকার ছিল? লেখা পাঠ করার পর পাঠক কে কী
ভাববেন তাও ঠিক করে দিতে হবে? পাঠকের বোধশক্তি সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করলেই কি গল্পের
গুণগত মান বেড়ে যাবে? আর গল্পগুলির সংক্ষিপ্ত বিবরণের সাথে যে পৃষ্ঠা নম্বর দেয়া আছে
তার সাথে মূল পৃষ্ঠা নম্বরের মিল নেই।
লেখকের কথায় লেখক নিজের লেখার স্টাইল আর যে ভাষা ব্যবহার
করেছেন তার সপক্ষে কথা বলতে গিয়ে কয়েকটি বিষয়ের অবতারণা করেছেন যা বিনাবাক্যে মেনে
নেয়া যায় না। তিনি লিখেছেন, “শিল্প সাহিত্যের শূন্য গোয়ালে গরু সেজে হানা দিচ্ছে ছাগল।“
প্রশ্ন হলো শিল্প-সাহিত্যে কে গরু, কে ছাগল তা নিরুপন করবেন কে? লেখক নিজেকে এই গোয়ালের
উন্নততম গরু ঘোষণা করলেই কি তিনি হয়ে গেলেন, আর তাঁর সমসাময়িক সবাই ছাগল হয়ে গেল? এই
বইতে তিনি সাধু আর চলিত ভাষার মিশ্রণ ঘটিয়ে একটি খিঁচুড়িভাষা তৈরি করেছেন এবং বলছেন
তা অতীব সুস্বাদু এবং মসৃণ হয়েছে। এই জগাখিচুড়ির পক্ষে বলতে গিয়ে বলছেন, “আমি বিশুদ্ধবাদের
দালাল নই। সবসময় বিশুদ্ধবাদিতার চাকর সেজে থাকা একজন সৃষ্টিশীল লেখকের পক্ষে সম্ভব
নয়।“ বাংলা ভাষা শুদ্ধভাবে লেখার নাম যদি বিশুদ্ধবাদের দালালি করা হয় বা বিশুদ্ধবাদিতার
চাকরি করা হয়, তাহলে অশুদ্ধভাবে লেখার নামই কি হবে সৃষ্টিশীলতা? অন্য কেউও যদি যেকোনকিছু
অশুদ্ধভাবে লিখে যদি দাবি করেন যে শুদ্ধবাদিতার চাকর তিনি নন – তাহলে কি মেনে নেয়া
হবে?
লেখক সাহিত্য সমালোচকদেরও খাটো করেছেন তাঁদেরকে ‘কিছু নির্দিষ্ট
নামের খাদেম’ বলে। তিনি আরও বলেছেন, “আমি অবাক হবো না, যদি এ বইয়ের আলোচনায় কেউ অপ্রাসঙ্গিকভাবে
কোনো মিনি-ফ্রয়েড বা মিনি দস্তয়েভস্কিকে টেনে আনেন।“ আমার পড়াশোনা খুবই সীমিত। ফ্রয়েড
এবং দস্তয়েভস্কি সামান্যই পড়েছি – তাতে এই লেখকের কোন গল্পেই তো তাঁদের নাম মনে পড়লো
না। প্রচন্ড আত্মগরিমা থেকেই তিনি এসব লিখে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব নিজে দাবি করেছেন। তবে
“কাঁচা পাঠক” যদি লেখকের নিজের কথা “বাঙালি যে-রূপে দুই কলম লেখাপড়া শিখিয়া রবীন্দ্রনাথের
জন্মদাত্রী সাজে, ডিকনস্ট্রাকশন, পোস্ট-কলোনিয়াল, সাব-অল্টার্ন, ফ্যাটালিজম, প্রভৃতি
জার্গন মুখস্থ করিয়া বুদ্ধিজীবীর উর্দি পরিধান করিয়া থাকে, সে-রূপে শুক্র গ্রহটি তাহার
আসল রূপ লুকাইয়া স্টার হইয়া মানুষদেরকে বিভ্রান্ত করিতেছে।“ [পৃ ৩৬] – ব্যতিক্রমহীনভাবে
সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য মনে করে বসে!
No comments:
Post a Comment